এক সময়ের ধান ব্যবসায়ী থেকে এমপি বনে যান রমেশ চন্দ্র সেন। হন একাধিক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দলে প্রবেশ করে পর্যায়ক্রমে হন দলের উপদেষ্টামণ্ডলী ও সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন। অভিযোগ আছে, এসব পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের উন্নয়নেই ব্যস্ত ছিলেন রমেশ। ঠাকুরগাঁওয়ে গড়ে তোলেন ত্রাসের রাজত্ব। এই রাজত্বে তিনি কেবল তার পছন্দের লোককেই দলীয় ও স্থানীয় সরকারের পদে বসাতেন। মতের বিরুদ্ধে গেলেই মামলা, হামলা আর নিপীড়ন চলত। তার ভয়ে তটস্থ থাকত নিজ দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণ। তার নিয়োগবাণিজ্য, টেন্ডারবাণিজ্য, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ- স্থানীয় রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রশাসনে যা ইচ্ছা তাই করতেন রমেশ চন্দ্র সেন।
রমেশ চন্দ্র সেনের গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কশালগাঁওয়ে। লেখাপড়া শেষ করে ধান ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের আ.লীগের সংসদ সদস্য খাদেমুল ইসলামের মৃত্যু হলে ১৯৯৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি উপনির্বাচনে ওই আসনে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে টানা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে রমেশ চন্দ্র সেনের রাজত্বেরও অবসান ঘটে। এরপর গত ১৬ আগস্ট ঠাকুরগাঁওয়ের নিজ বাড়ি থেকে তাকে একটি বিস্ফোরক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আরও একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘ সময় ঠাকুরগাঁও-১ আসনে এমপি, সরকারের মন্ত্রিত্ব এবং আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় জেলায় নিজের ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করেন রমেশ চন্দ্র সেন ও তার স্বজনরা। রমেশ চন্দ্র সেনের ছেলে (ভাতিজা) রুহিয়া থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি পার্থ সারথী সেন বিভিন্ন ধরনের টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। রমেশ ও পার্থ সেন মিলে গড়ে তোলেন ‘সেন গ্রুপ’ নামে একটি কোম্পানি। রমেশ যখন পানি সম্পদমন্ত্রী ছিলেন, ওই সময় মন্ত্রণালয়ের সব ঠিকাদারির কাজ প্রায় একাই বাগিয়ে নিত এই কোম্পানি। এর মাধ্যমে হাজার-হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেন রমেশ চন্দ্র সেন ও পার্থ সারথী সেন। এর পাশাপাশি কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে জেলার রুহিয়া এলাকায় গড়ে তোলেন একটি রাইস মিল। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সব ঠিকাদারি কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতেন রমেশ চন্দ্র সেন ও পার্থ সারথী সেন। সরাসরি রমেশের নিয়ন্ত্রণে চলত জেলার পরিবহন সেক্টরসহ সব সেক্টরের চাঁদাবাজি।
অন্যদিকে রমেশের ভাই অনিল চন্দ্র সেন ছিলেন রুহিয়া পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও থানা আ.লীগের সহসভাপতি। অনিলের কথাতেই রুহিয়া থানা থেকে শুরু করে সব দপ্তরের কাজ হতো। তার বিরুদ্ধে গেলেই করা হতো মামলা, হামলা, হয়রানি।
পরিবারের বাইরে রমেশের নিজের লোক ছিলেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশারুল ইসলাম সরকার ও জেলা আ.লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম স্বপন। অভিযোগ আছে, রমেশের ইশারায় তারা যুক্ত ছিলেন মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে।
রমেশের আরেক বিশেষ ঘনিষ্ঠ লোক ছিলেন ‘মুক্তা রাণী’। তার নিয়ন্ত্রণে ছিল জেলার ‘২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল’। তার দাপটে অতিষ্ঠ ছিল হাসপাতালের চিকিৎসক থেকে শুরু করে সব স্টাফ। এই হাসপাতালে রোগীদের মাঝে খাদ্য সরবরাহ, ওষুধ সরবরাহ করত মুক্তা রাণীর ভাতিজা নিপুণ। এ ছাড়াও রমেশের নির্দেশনায় টাকার বিনিময়ে হাসপাতালে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় লোকবল নিয়োগ ও সরকারি নিয়োগে হস্তক্ষেপ ছিল তার। মুক্তা রাণী রাতারাতি বনে যান কোটিপতি।
শহরের শান্তিনগর এলাকার সাইফুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় চাকরি করার জন্য মুক্তা রাণীকে তার ভাতিজা নিপুণের মাধ্যমে ৪ লাখ টাকা দিয়েছিলাম; কিন্তু আমার চাকরি হয়নি। আমাকে টাকাও ফেরত দেয়নি। টাকা চাইতে গেলে মুক্তা রাণী আমাকে লাঞ্ছিত করেন ও নিপুণ আমাকে মারপিট করে তাড়িয়ে দেয়।
রমেশ চন্দ্র সেন ও তার স্বজনদের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন স্থানীয় সংবাদকর্মীরা। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সাংবাদিকদের দমন করতে রমেশ চন্দ্র সেন স্থানীয় সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একাধিক মামলাও দিয়েছেন।
স্থানীয় সংবাদকর্মী তানভীর হাসান তানু বলেন, করোনার সময় হাসপাতালের খাবারে অনিয়ম সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট করি। সেই রিপোর্টের কারণে তৎকালীন সংসদ সদস্য রমেশের নির্দেশে আমিসহ আরও কয়েক সংবাদকর্মীর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দেওয়া হয়। এখনও আমরা ওই মামলায় নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিয়ে যাচ্ছি।
দলীয় পদ-পদবি ও মনোনয়নপত্র বিক্রির অভিযোগও রয়েছে রমেশ ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে। জেলা আওয়ামী লীগ, উপজেলা আওয়ামী লীগ, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিতেও সরাসরি হস্তক্ষেপ করতেন সাবেক এমপি ও মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন। নাম গোপন রাখার শর্তে এক জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, এমন কোনো অপরাধ নেই রমেশ চন্দ্র সেন করেন নাই। সদর আসনের সব সিন্ডিকেটের নায়ক তিনি। নিয়োগবাণিজ্য, টেন্ডারবাণিজ্য, চাঁদাবাজিÑ এসবের গডফাদার ছিলেন রমেশ চন্দ্র সেন। তার নির্দেশে এসব বাস্তবায়ন করত পার্থ সারথী সেন, মোশারুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম স্বপনসহ তার অনুসারীরা। রমেশের বিরুদ্ধে কথা বললেই অপমান, অপদস্ত, লাঞ্ছিত করত তার ঘনিষ্ঠজন মোশারুল ইসলাম ও নজরুল ইসলাম স্বপন।’
ঠাকুরগাঁও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বাবু বলেন, ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মধ্যে পরিবার পরিকল্পনার সুপারভাইজার পদে চাকরির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। কিন্তু সাবেক এমপি রমেশের জন্য আমার চাকরিটা হয়নি। তিনি তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিমকে ফোন করে আমাকে ভাইভা থেকে বাদ দিয়ে দেন। অন্য একজনকে টাকার বিনিময়ে চাকরি দেন।
ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মনোয়ার সিদ্দিক মুন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করেছি। তার বদলে কী পেয়েছি জানেন? রমেশ চন্দ্র সেনের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা। রমেশের নিয়ন্ত্রণে সড়কে চাঁদাবাজি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ বাণিজ্যের প্রতিবাদ করাই আমার কাল হয়।
ঠাকুরগাঁও সদরের চিলারং ইউনিয়ন আ.লীগের সভাপতি ঋষিকেষ রায় লিটন বলেন, ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতি ধ্বংসের একমাত্র কারিগর রমেশ চন্দ্র সেন। তিনি তার ইচ্ছামতো যা মন চেয়েছে, তাই করেছেন। আমি যদি আমার উদাহরণ দেই- আমি দলীয় প্রতীক নৌকা মার্কা নিয়ে ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। কিন্তু রমেশ চন্দ্র সেন আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ফজলুর রহমানের কাছ থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা নিয়ে ভোটের ফলাফল পাল্টে তাকে চেয়ারম্যান করে দেন।
রমেশ চন্দ্র সেন কারাগারে থাকায় এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অভিযুক্ত অন্যরাও বিভিন্ন মামলার আসামি ও পলাতক থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া যায়নি। তবে রমেশ চন্দ্র সেনের সহধর্মিণী অঞ্জলি রাণী সেন বলেন, আমার স্বামী সব সময় মানুষের সেবা করে গেছে। সদর আসনের উন্নয়নের জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করেছে। সে কখনও কোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না। তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে।
বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৪
Author: ajkerthakurgaon
দৈনিক আজকের ঠাকুরগাঁও.কম একটি জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পোর্টাল। নির্ভীক, অনুসন্ধানী, তথ্যবহুল ও স্বাধীন সাংবাদিকতার অঙ্গীকার নিয়ে শুরু হয়েছে।

0 coment rios: