শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৪

চরের উটখ্যাত ঘোড়ার গাড়ি, জড়িত ৫ শতাধিক গাড়োয়ান

‘নদীর একূল ভাঙে ওই কূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা’Ñ এমন ভাঙা-গড়ার মাঝেই মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের অংশে পদ্মার বুকে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চর। নদীভাঙা অন্য চরের মানুষ এরপর ওইখানেই জায়গা করে নেয়। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে তারা বেঁচে থাকেন। সহায়-সম্বল হারানো মানুষ নতুন চরে নতুন জীবন শুরু করেন। চরের জীবিকা বলতে কৃষিকাজ, মাছ শিকার এবং ঘোড়ার গাড়িতে পণ্য পরিবহন। চরে কোনো রাস্তাঘাট বা সড়ক পথ নেই। নেই কোনো অবকাঠামো। খাদ্যশস্য, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য মালামাল বহনের কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ঘোড়ার গাড়ি। আর ঘোড়া গাড়িতে পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে জীবিকা উপার্জন করছেন ৫ শতাধিক গাড়োয়ান। প্রাচীনকালে মরু অঞ্চলে মানুষ ও পণ্য পরিবহনের জন্য যেমন উটের ব্যবহার হয়ে আসছিল, তেমনি হরিরামপুরের চরাঞ্চলে ঘোড়াকে চরের উট সঙ্গে তুলনা করছেন রসিক গাড়োয়ানরা। চরাঞ্চলবাসীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় জানা যায়, আশির দশকে হরিরামপুরের ভেতর দিয়ে বয়ে সর্বনাশা ভয়ালার পদ্মার বুকে জেগে ওঠে বিশাল চর। এরপর ৯৮ সালের বন্যার পর সেখানে জনবসতি গড়ে ওঠে। পদ্মা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তরা সেখানে স্থানীয়ভাবে বসবাস শুরু করেন। বিজ্ঞাপন চরাঞ্চলে পণ্য পরিবহনে নদীপথের জন্য ডিঙি নৌকা আর ডাঙার জন্য রয়েছে ঘোড়ার গাড়ি। চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের পেশা মাছ শিকার। কিছু মানুষ চরের জমিতে চাষাবাদ করেন। এছাড়া অনেকে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। দিন দিন বাড়ছে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার। হরিরামপুর উপজেলা সদর থেকে পদ্মার বুকে জেগে ওঠা চরের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। পদ্মা অধ্যুষিত হরিরামপুরের সূতালড়ী, আজিমনগর, লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ এবং কাঞ্চনপুর ও ধুলসুরা ইউনিয়নের একাংশসহ প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষপত্র ও দৈনন্দিন চাহিদার জন্য চরাঞ্চলে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি হাটবাজার। এছাড়া সন্তানদের শিক্ষার জন্য সরকারি- বেসরকারিভাবে স্থাপন করা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ধর্মীয় শিক্ষালয়। চরাঞ্চল থেকে উপজেলা সদর ও শহরের যাতায়াত ও পারাপারের একমাত্র মাধ্যম ইঞ্জিনচালিত খেয়াঘাটের নৌকা। সরেজমিন দেখা যায়, চরাঞ্চলের রাস্তাঘাটের কিছুটা আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। চরের অধিকাংশ রাস্তা কাঁচা ও আধাপাকা, কোথাও পিচ ঢালাই। কাচা রাস্তায় মোটরসাইকেল ও দুই চাকার ঘোড়ার গাড়ি যাতায়াত করতে পারে। চরাঞ্চলের ফসল পরিবহনের জন্য একমাত্র বাহন ঘোড়ার গাড়ি। আর নদীপথে নৌকা। খেয়াঘাটে চরের পণ্য নামানোর পর ঘোড়ার গাড়ির মাধ্যমে সদরের হাটবাজারে নেওয়া হয়। এছাড়া খেয়াঘাট থেকে গোড়ার গাড়িতে মালামাল তোলার জন্য রয়েছে ঘাট কুলি। ঘাট কুলির সাহায্যে গাড়োয়ানরা মালামাল তুলে নিয়ে যায়। চরাঞ্চলের গাড়োয়ান মো. নূরুল ইসলাম জানান, কমপক্ষে ১০ বছর ধরে চরে ঘোড়ার গাড়িতে মালামাল আনা-নেওয়া করি। কিন্তু ঘোড়ার গাড়ি বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো আয়-রোজগার হয় না। তিনি আরো বলেন, এখন মহাজনের মালামাল বহন করি আর বাকি সময় কামলা দিই। মহাজনের যখন দরকার হয়, ফোন দিলেই চলে যাই। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় এক কাজের আয় দিয়ে সংসার চলে না। কাজিকান্দা এলাকার গাড়োয়ান রুবেল মোল্লা জানান, আজিমনগর থেকে ভুট্টার বস্তা নিয়ে হরিণা খেয়াঘাট যাচ্ছি। ভুট্টার মালিক বস্তা প্রতি ৫০ টাকা দিবে। তাতে সারা দিন ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা রোজগার করতে পারি। ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে যা আয়-রোজগার হয়, তাই দিয়ে আমার সংসার চলে। তিনি বলেন, চরের ঘাস ছাড়াও মাঝেমধ্যে ঘোড়াকে খাবার কিনে খাওয়াতে হয়। ঘোড়ার অসুখ-বিসুখ বা গাড়ি নষ্ট হলে মেরামত করতে হয়। ঘোড়া ও গাড়ির পেছনে খরচ আছে। আরেক গাড়োয়ান সুজন শেখ জানান, সংসারে অভাব-অনটনের কারণে ৩ বছর ঘোড়ার গাড়ি চালাই। কিন্তু অভাব দূর হয় নাই। এখন ঘোড়ার গাড়ির কাজের পাশাপাশি কামলা দিই আর বাড়িতে গরু লালন-পালন করি। আগে শুধু মালিকদের মালামাল বহন করতাম। এখন সব মালামাল বহন করি। বিজ্ঞাপন তিনি আরো বলেন, আরব দেশে মরুভূমিতে মানুষ উট চালায় আর আমরা চরে ঘোড়ার গাড়ি চালাই। আমাগো কাছে ঘোড়ার গাড়ি মানে চরের উট। তবে আসলে আমরা তো চরের মানুষ। ‘আমাগো ভাগ্যই খারাপ। বর্ষার সময় পানিতে আর শীতের সময় শীতে সমস্যা। তাছাড়া রোদ-গরম তো আছে। সত্য কথা বলতে আমাগো চরে বারো মাস যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়। আমাগো তো দিন আই্যনা দিন খাইতে হয়। এক টাকাও জমা করতে পারি না।’ হরিরামপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. জহুরুল ইসলাম বলেন, ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে একশ্রেণির মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। তারা কৃষিকাজসহ বিভিন্ন কাজ করে থাকেন। তবে আগের তুলনায় চরের রাস্তাঘাটের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সরকারিভাবে আমরা তাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতে পারব না। তবে ঘোড়ার কোনো চিকিৎসা বা কোনো পরামর্শ দিতে পারব। তাছাড়া চরাঞ্চলের মানুষের গরু-ছাগলসহ যেকোনো প্রাণীর চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব।

শেয়ার করুন

Author:

দৈনিক আজকের ঠাকুরগাঁও.কম একটি জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পোর্টাল। নির্ভীক, অনুসন্ধানী, তথ্যবহুল ও স্বাধীন সাংবাদিকতার অঙ্গীকার নিয়ে শুরু হয়েছে।

0 coment rios: