চারজন লোক। পরনে সাদা পোশাক (সিভিল ড্রেস)। সঙ্গে অস্ত্র। কোনো কথা নেই। হঠাৎ এক শিক্ষার্থীকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তখন নিজেকে বাঁচাতে শিক্ষার্থীর সীমাহীন আর্তনাদ। তবুও যেন সেই আর্তনাদের আওয়াজ পৌঁছায় না তাদের কানে। টেনে হিঁচড়ে ওই শিক্ষার্থীকে নিয়ে যেতে থাকেন।
চব্বিশের কোটাবিরোধী আন্দোলন চলাকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক মৌন মিছিল থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আটকের চেষ্টা করে সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু একদল সদস্য। যারা বিনা কারণে শিক্ষার্থীদের চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যেতে থাকেন। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন নির্মম চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি ফলক চত্বরে আয়োজিত ‘আলোকচিত্রে জুলাই বিপ্লব ২৪’ শীর্ষক স্মারক, গ্রাফিতি ও পোস্টার প্রদর্শনীর একটি ছবিতে। আয়োজকরা ছবিটির নাম দিয়েছেন ‘নিপীড়ক ও নিপীড়িত’।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ২৪-এর জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের গৌরবউজ্জল ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে অন্তত দেড় শতাধিক আলোকচিত্র নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি ফলক চত্বরে গত ১৪ ডিসেম্বর এই জুলাই বিপ্লবের স্মৃতি স্মারক, গ্রাফিতি ও পোস্টার প্রদর্শনীর শুরু হয়। চলবে আগামী ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তিন দিনব্যাপী প্রদর্শনীটির আয়োজন করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
প্রদর্শনীর আলোকচিত্রে ‘ঐতিহাসিক ১৬ জুলাই’, ‘বিজয় উল্লাস’, ‘বিশ্বজিতের কণ্ঠস্বর’, ‘গণজোয়ার’, ‘সংখ্যায় বেশি হলেও ভয় তাদেরই বেশি’, ‘ঠিক সন্ধ্যা নামার আগে হায়েনাদের হানা’, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডের ভিন্ন চিত্র’, ‘নেকড়ের সন্ত্রাস’, ‘শেষরাতের দাদাগিরি’, ‘এক চুমুক কোক ও সিঙ্গারার শেষ সমাবেশ’, ‘জুলাই বিপ্লবে বাংলাদেশে প্রথম ছাত্রলীগের পালানোর দৃশ্য’ শিরোনামে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ভেসে ওঠে এমন চিত্র ফুটে উঠেছে। সেসব আলোকচিত্র দর্শনার্থীরা দলে দলে এসে দেখছেন। নিজেদের মধ্যে সঞ্চার করছেন জুলাই বিপ্লবের গৌরবউজ্জল ইতিহাস। এমনকি বিজয়ের মাসে এই আয়োজনকে বিজয়ের সর্বজনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন তারা।
প্রদর্শনীতে ঘুরে ঘুরে আলোকচিত্র দেখছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম। কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম বিজয় এসেছিল ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরে। তবে, এ বিজয়কে নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে কুক্ষিগত করে রেখেছিল একটা ফ্যাসিস্ট শাসন। এ বছরের জুলাইয়ে স্বৈরাচারের পতনের পরে চলতি বছরের বিজয় দিবস হয়েছে সর্বজনের বিজয়। দিবস উপলক্ষে করা জুলাই বিপ্লব আলোচিত্রে প্রদর্শনী আমাদেরকে দুইটি বিজয়কে একই দৃষ্টিতে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে পথচলার নতুন মাত্রা যোগ করবে। এ ধরনের আয়োজন তরুণ সমাজকে সাহসের সঞ্চয় করতে সহায়তা করবে।’
এই আয়োজনকে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মেহেদী সজীব। তিনি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব নিয়ে যত কাজ হবে এর স্মৃতিগুলো ঠিক ততটাই আমাদের মানসপটে ভেসে উঠবে। জুলাই আমাদেরকে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ করেছিল। কিন্ত, বর্তমানে সে ঐক্যে কিছুটা ঘাটতি দেখা যায়। এমন আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র গঠনের কাজে আবারো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার ঐক্য ও সমৃদ্ধি আসবে।’
আয়োজনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে দ্বিতীয়বার গড়ে তোলার সুযোগ এসেছে। সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা মানুষকে আবার মনে করিয়ে দেওয়াই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য। মানুষের মধ্যে এটা প্রবেশ করানো যে, অভ্যুত্থানের সময়টা অনেক কঠিন ছিল। ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এটাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। তাদের এ স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে দেশকে দ্বিতীয়বার গড় তোলার প্রত্যয়কে আরও অনুপ্রাণিত করবে এ আয়োজন।’
রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৪
Author: ajkerthakurgaon
দৈনিক আজকের ঠাকুরগাঁও.কম একটি জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পোর্টাল। নির্ভীক, অনুসন্ধানী, তথ্যবহুল ও স্বাধীন সাংবাদিকতার অঙ্গীকার নিয়ে শুরু হয়েছে।

0 coment rios: